ইয়েমেনের অবস্থা প্রাচীন আরব গোত্রগুলোর মত, তারা কোন্ কারণে লড়াই শুরু করত ভুলে যেত। তারপর ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে যুদ্ধ করার পর সম্পূর্ণ শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেলে ক্ষান্ত হত। ইয়ামেনিরা যদি আপন শক্তিতে যুদ্ধ করত তাহলে হয়ত এতদিনে তাদের শক্তি ফুরিয়ে যেত এবং ক্লান্তি ও অবসাদজনিত শান্তি তাদেরকে পেয়ে বসত। কিন্তু তাদের যুদ্ধযন্ত্র অফুরান জ্বালানি-ভাণ্ডারের সাথে যুক্ত। একদিকে সৌদি-আমিরাতি তেলের খনি অপরদিকে ইরানি জ্বালানি ভাণ্ডার।
২০১১ সালে ইয়েমেনে বসন্ত এসেছিল, উৎখাত হয়েছিল চার দশকের স্বৈরশাসক দূর্নীতিবাজ আলি আবদুল্লাহ সালেহ। তবে অচিরেই ইয়েমেনি বসন্ত পরিণত হয় ঝাঁজালো গ্রীষ্মে। ইয়েমের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল খুবই দুর্বল। সেনাবাহিনী, রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তির অনুগত ছিল। রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের চেয়ে দলীয় ও গোত্রীয় আনুগত্য ছিল প্রবল। ক্যারিশম্যাটিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করে। ফলে দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসকের পতনজনিত শূন্যতায় স্বার্থান্বেষী মহল ও গোষ্ঠীগুলো নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারে চারদিক থেকে ছুটে এসে এক দুষ্ট চক্র সৃষ্টি করে, গরম হাওয়া উপরে ওঠে যাওয়ার পর চারপাশের ঠাণ্ডা বায়ু যেমনি ঘূর্ণিবাত্যা তৈরী করে। ইয়েমেনের শিয়া-সুন্নীদের মাঝে প্রভেদ প্রকট ছিল না। এক দল অপর দলের মসজিদে সালাত আদায় করত। কিন্তু সঙ্কটের সূচনার পর অচিরেই ধর্মীয় সহনশীলতা রাজনৈতিক ঘৃণায় পর্যবসিত হল। এ সুযোগে ইয়েমেনে সক্রিয় হল মধ্যপ্রাচ্যের দুই রাজনৈতিক মোড়ল সৌদি আরব ও ইরান, সৌদি সাথে সম্পৃক্ত হল জেলে জীবন ত্যাগ করে সদ্য মোড়লিপনায় যুক্ত হওয়া আমিরাত।
আমার ধারণা ২০১৮ সালে এসে ইয়েমেনিরা ভুলে গেছে ৭ বছর আগে তারা কী কারণে আত্মহনন শুরু করেছিল। খবরে প্রকাশ ইয়েমেনিদের বিভক্তি আরো বেড়েছে। বিশেষত, এডেন বন্দরকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন প্রদানের বিষয়ে সৌদি-আমিরাত সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টির উপক্রম হয়েছে। ইরানিরা হুথিদের পক্ষে। সৌদি-আমিরাত ছিল প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদির পক্ষে। রাজধানী সানা হুথিদের দখলে। সৌদি-আমিরাত বাহিনী প্রেসিডেন্টের জন্য এডেন মুক্ত করে দিয়েছিল যেখানে তিনি অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। ইদানিং খবর বেরিয়েছে দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি গ্রুপ আমিরাতি সহযোগিতায় মনসুর হাদির গ্রুপকে এডেন হতে তাড়িয়ে দিয়েছে। এটি ইয়েমেন পলিসিতে সৌদি ও আমিরাতের মতভেদের ইঙ্গিত বহন করে। এটা যদি সত্য হয় তাহলে অচিরেই ইয়েমেনের দ্বিপাক্ষিক লড়াই বহুপাক্ষিক লড়াইয়ে রূপান্তরিত হবে। বিবদমান পক্ষগুলোর শক্তি সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ হওয়ার আগে ইয়েমেনে শান্তি আসার কোন সম্ভাবনা নেই। তবে বিদেশি হস্তক্ষেপের কারণে লড়াইরত গ্রুপগুলো শক্তি অচিরেই নিঃশেষিত হবে, এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।