সিয়াম ও সাওম কি অভিন্ন? অভিধান এবং হাদীস ও ফিকহের গ্রন্থ তল্লাশিতে তাই মনে হয়। সিয়াম ও সাওম – দুটিই ক্রিয়ামূল, অর্থ: বিরত থাকা। পরিভাষায় কিছু নির্দিষ্ট কাজ [যা আমাদের জানা] হতে নির্দিষ্ট সময় বিরত থাকার নাম সিয়াম বা সাওম, এ ইবাদাতটি আমাদের কাছে রোযা নামে পরিচিত।

হাদীসের গ্রন্থগুলোতে `সিয়াম’ ও `সাওম’ শব্দদু’টির একটির স্থলে অপরটিকে ব্যাপকহারে ব্যবহার করা হয়েছে। সাহীহুল বুখারী ও জামিউত তিরমিযী-এর রোযা অধ্যায়ের শিরোনামে ‘সাওম’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সাহীহ মুসলিম ও আবু সুনান আবি দাউদের অধ্যায় শিরোনামে রয়েছে ‘সিয়াম’ শব্দের উপস্থিতি। ফিকহ গ্রন্থগুলোতে রোযা অধ্যায়কে সাধারণত ‘কিতাবুস সাওম’ বলা হয়। এতে বুঝা যায় ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ পরিভাষা হিসেবে ‘সিয়াম’ ও ‘সাওম’ শব্দদু’টিকে শতভাগ সমার্থবোধক বলে বিবেচনা করেছেন।

কিন্তু আল-কুরআনের প্রচলনে শব্দ দু’টির মাঝে কিছুটা পার্থক্য দেয়া যায়। ‘সিয়াম’ শব্দটি কুরআনে ৭ স্থানে (বাকারা, ১৮৩, ১৮৭, ১৯৭; নিসা, ৯২; মায়িদা ৮৯, ৯৫; মুজাদালা ৪) এসেছে। প্রতিটি স্থানে এটির অর্থ প্রচলিত ‘সিয়াম’ বা একটি নির্দিষ্ট ইবাদাত, যা আমাদের কাছে রোযা বলে পরিচিত। পক্ষান্তরে ‘সাওম’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে মাত্র একটি স্থানে: সূরা মারইয়াম ২৬। আল-কুরআনের এ স্থানে ‘সাওম’ বলতে ‘সিয়াম’ বা ‘রোযা’ বুঝানো হয়নি। শিশুপুত্র ঈসা (আ) এর জন্মের পর তাঁর মাতা মারইয়ামকে গোত্রের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এ নির্দেশনা দেন যে, তুমি খাও, পান কর আর তোমার চক্ষু শীতল কর; যদি তোমার গোত্রের কাউকে দেখতে পাও, তাহলে (তাদের কুপ্রশ্নের জবাব না দিয়ে) বল, আমি রাহমানের জন্য ‘সাওম’ মানত করেছি। তাহলে বুঝা গেল এখানে ‘সাওম’ মানে পানাহার বর্জন নয়; যেহেতু আয়াতের শুরুতে তাকে পানাহার করতে বলা হয়েছে। বরং এখানে সাওমের অর্থ হল অনর্থক তর্ক-বিতর্ক, ও বাজে কথা এবং তদুর্ধ মন্দ কথাবার্তা (যেমন মিথ্যা, গালিগালাজ ইত্যাদি) বর্জন করা।
আমার ধারণা, প্রাথমিক যুগে ‘সিয়াম’ ও ‘সাওম’-এর এ পার্থক্যটি মেইনটেইন করা হত। ধীরে ধীরে ব্যাপকহারে ‘রেওয়ায়েত বিল মা‘না’ বা অর্থগত বর্ণনা করা হয়। তখন সিয়াম ও সাওম পরস্পরের স্থলে ব্যবহার হতে হতে দু’টিই শতভাগ সমার্থবোধক শব্দে পরিণত হয়। এতে অসুবিধার কিছু নেই। বরং সিয়াম-এর অর্থে পূর্ণাঙ্গতা এসেছে। সিয়ামের একটি অভ্যন্তরীণ রূপ আছে যা সাওম-এ পাওয়া যায়। এ কথাটি বুঝার জন্য নিম্নের হাদীসটি বিবেচনা করা যেতে পারে: ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কথার ভিত্তিতে কাজ পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।’ এ হাদীসে ‘সিয়াম ও সাওম-এর মাঝে সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। হাদীসের প্রথম অংশটি সাওম সম্পর্কিত, দ্বিতীয় অংশটি সিয়াম সম্পর্কিত। মানে হল, যে ব্যক্তি সাওম পালন করবে না, তার সিয়ামে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ রোযা হল সেটি যাতে সিয়াম ও সাওম-এর সম্মিলন ঘটে। অন্য কথায়, পানাহার পরিত্যাগের পাশাপাশি, মিথ্যা, গীবত, চোগখুরিসহ অন্যান্য নিষিদ্ধ কথাবার্তা ও কাজ বর্জন করলেই রোযা পূর্ণাঙ্গ হয় এবং তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়। সিয়াম ও সাওম শব্দের সমার্থবোধকে পরিণত হওয়া এ পূর্ণতার ইঙ্গিতই করে।