মহাগ্রন্থ আল-কুরআন হেদায়াতের গ্রন্থ। দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তি অর্জনের জন্য মানুষকে আল্লাহর পথ প্রদর্শনই এই গ্রন্থ নাযিলের মূল উদ্দেশ্য। তবে আল-কুরআনের প্রতিটি আয়াত বিপুল জ্ঞানের আধার। গভীর অভিনিবেশের সাথে অধ্যয়ন করলে আল-কুরআন হতে জীবনঘনিষ্ঠ বহু জ্ঞানশাখা উদ্ভাবন করা সম্ভব।

তেমন একটি দিক হল ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান। আল-কুরআনের সাথে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সম্পর্কের আলোচনায় দু’টি শব্দ উল্লেখই যথেষ্ট: মালিক ও ফিরআউন।
কুরআনের উল্লেখিত একটি চমকপ্রদ কাহিনী হল নবী ইউসুফের (আ) গল্প। তাঁর পরিবারের আদিনিবাস ছিল কেনআনের হেবরনে। ভাইদের ষড়যন্ত্রে তিনি মিশরে নীত হন। খুব সম্ভবত এটি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৬৭৯ অব্দের ঘটনা। বহু ঘটনার পর তিনি মিশরের রাজদরবারে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। ইউসুফ (আ) এর ঘটনার সময়ে মিশরের শাসকের উপাধি/পদবি হিসেবে আল-কুরআনে ‘মালিক’ বা বাদশাহ শব্দ উল্লেখ করা হযেছে (সূরা ইউসুফ, ৭২)। কীভাবে ইউসুফ (আ)-এর পিতামাতা ও ভায়েরা তথা বনি ইসরাইল কেনআন হতে মিশরে স্থানান্তরিত হন, তা আমরা কুরআন ও বাইবেলের বিবরণ হতে জানতে পারি।
বনি ইসরাঈলের মিশরে হিজরত করার প্রায় তিনশত বছর পর জন্মগ্রহণ করেন নবী মূসা (তাঁর জীবনকাল: আনুমানিক ১৩৯১-১২৭১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। আল-কুরআনের বহু স্থানে নবী মূসার (আ) দাওয়াতি সংগ্রাম ও নিজভূমে প্রত্যাবর্তনের কাহিনী বিধৃত হয়েছে। প্রসঙ্গত ওই সময়ের মিশরের ঔদ্ধত শাসকের কথাও এসেছে। কুরআনে তাঁর উপাধি/পদবি হিসেবে ‘ফিরআউন’ শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে।
এটি খুব চিন্তা ও ভাবনা উদ্রেককারী বিষয়। ইউসুফ (আ)-এর সময়ের মিশরশাসকের উপাধি ‘মালিক’ আর মূসা (আ) এর যমানার মিশরের শাসকের উপাধি ‘ফিরআউন’!! কেন? অথচ বাইবেলে (যেটিকে কুরআনে তাওরাত বলা হয়েছে এবং যা নাযিল হওয়ার দৃষ্টিকোণে কুরআনের চেয়ে প্রাচীন) দুই সময়ের শাসকের জন্য একটি উপাধিই অর্থাৎ ফিরআউন ব্যবহার করা হয়েছে (আদিপুস্তক ৩৯)।
দুই সময়ের দুই শাসকের পদবি উল্লেখের ক্ষেত্রে কুরআনের এই তারতম্য অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে মিশরের প্রাচীন ইতিহাসে তত্ত্বানুসন্ধান করতে হবে।
প্রাচীনকালে বহু রাজবংশ মিশর শাসন করেছে। এদেশের প্রাচীন ইতিহাস হতে জানা যায়, অষ্টাদশ শাসক পরিবারের আমলে তথা আনুমানিক ১৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হতে রাজার উপাধি হিসেবে ‘ফেরাউন’ শব্দটি চালু হয়। শব্দটির অর্থ ‘বড় ঘর বা বড় পরিবার।’ ১৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-এর পূর্বে মিশরের শাসকের যে উপাধি ছিল সেটির আরবী অনুবাদ ‘মালিক (বাদশাহ)।’ আমরা জানি ইউসুফ (আ) মিসরে গমন করেছিলেন আনুমানিক ১৬৭৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, দেখা যাচ্ছে ওই সময় মিশরের শাসকের উপাধি ছিল মালিক। তাই কুরআনেও মালিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। মূসা (আ) এর জন্মের পূর্বেই মিশরের বাদশাহর উপাধি পরিবর্তিত হয়ে ফেরাউন হয়ে যায়। তাই মূসা (আ) এর কাহিনীর উল্লেখ করার সময় মিশরের শাসককে ফেরাউন বলা হয়েছে। অর্থাৎ শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আল-কুরআনের শব্দ ব্যবহারের ঐতিহাসিক বিবর্তন রক্ষা করেছে, যেমনটি করতে পারেনি আল-কুরআনের চেয়ে প্রাচীন কিতাব (অন্তত নাযিলের দৃষ্টিকোণে) তাওরাত বা বাইবেল।
আপনি হয়ত বলতে পারেন, এটা উল্লেখ করার বিষয় হল? থামুন! ভাবুন! মিশরের বাদশাহর উপাধি কোন্ যমানায় কি ছিল, তা কুরআন নাযিলকালীন মানুষ জানত না। অনেক শতকধরে মিশরীয়রাও জানত না। বহুকাল পরে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে পিরামিডগুলো আবিষ্কার হওয়ার পর ফরাসি পণ্ডিতরা হায়েরোগ্লিফিকের পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন। তখন মিশরের প্রাচীন ইতিহাসের বহু উপাদান আবিষ্কৃত হয়। আর তখনই মানুষ জানতে পারে ফেরাউন ব্যতীত মিশরের বাদশাহদের ভিন্ন উপাধিও ছিল। অর্থাৎ প্রত্নতাত্বিক আবিষ্কারের মাধ্যমে দেড়-দুশো বছর পূর্বে মানুষ যে তথ্য জানতে পেরেছে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে আল-কুরআনে সেটি নিহিত ছিল। কুরআন যে আল্লাহর বাণী, এটি তার আরেক প্রমাণ।
শব্দের পরিবর্তনের ইতিহাস সংক্রান্ত অধ্যয়নকে বলা হয় Etymology, এটি ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের একটি শাখা। বলাবাহুল্য, এটিও খুব পুরনো শাস্ত্র নয়। আল-কুরআনে এই শাস্ত্রের উপাদানের উপস্থিতি এই ইঙ্গিত করে যে, গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে আল-কুরআন হতে মানুষের কল্যাণে বহু নতুন জ্ঞানশাখা আবিষ্কার করা সম্ভব।